শবে বরাত - করণীয় ও বর্জনীয়
শবে বরাত: সহিহ সুন্নাহর আলোকে করণীয় ও বর্জনীয়
আসসালামু আলাইকুম।
শাবান মাস চলছে, আর আমাদের সামনেই কড়া নাড়ছে নিসফু শাবান বা শবে বরাত। এই রাতটি নিয়ে আমাদের সমাজে যেমন অনেক অতিভক্তি আছে, তেমনি আছে অনেক বিভ্রান্তিও। কিন্তু একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দেখা উচিত কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আসলে এই রাত সম্পর্কে কী বলে।
অনেক আলেম মনে করেন এই রাতের কোনো ভিত্তি নেই, তবে মুহাদ্দিসগণের গবেষণায় দেখা যায়—রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে সহিহ বা হাসান পর্যায়ের হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
রাসূল (সা.) বলেছেন,عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: "إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلاَّ لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ” "আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাতে
(নিসফু শাবান) সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং দুই শ্রেণির লোক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন—১.
মুশরিক
যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে (অথবা যারা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে নামাজ, রোজা,হজ এবং ইত্যাদি ইবাদত করে এবং যারা অন্যায়ভাবে , জুলুম করে পরের টাকা পয়সা, অর্থ-সম্পদ ভোগ করে তাদেরকে ও আজ রাতে মাফ করা হবে না।)
এবং ২.
মুশাহিন- যার অন্তরে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ আছে (তবে যারা অন্যের কোন গুনাহ বা অপরাধের প্রতি হিংসা-বিদ্ধেষ পোষণ করে তারা ব্যাতীত)।" (সিলসিলাতুস সহিহাহ: ১১৪৪, ইবনে মাজাহ: ১৩৯০)।
সুতরাং, এই রাতের মূল শিক্ষা হলো নিজের অন্তরকে শিরক ও হিংসা থেকে মুক্ত করা।
: কিন্তু আফসোস, আমরা ইবাদতের নামে এমন কিছু করছি যার প্রমাণ সুন্নাহতে নেই।
* হালুয়া-রুটির উৎসব:
একে খাদ্যের উৎসবে পরিণত করার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। তবে হ্যাঁ এই রাতে ইবাদত বা রোজা রাখার উদ্দেশ্যে সুস্বাদু খাবার খেতে নিষেধ নেই।
* আতশবাজি ও আলোকসজ্জা: এটি অপচয় এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি,এটি পরিলক্ষিত হয় বেশিরভাগ শহরের মসজিদ গুলোতে।
* নির্দিষ্ট সংখ্যার নামাজ:
১০০ রাকাত বা নির্দিষ্ট সুরা দিয়ে পড়ার যে নিয়ম প্রচলিত আছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট বা মওজু হাদিস ভিত্তিক,এটি ও পরিলক্ষিত হয় বেশিরভাগ শহরের মসজিদ গুলোতে।
* কবরস্থানে গণজমায়েত: রাসূল (সা.) একাকী জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন জিয়ারতের উদ্দেশ্যে কিন্তু প্রতি বছর এটাকে উৎসবে পরিণত করার প্রমাণ নেই। তবে হ্যাঁ এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে,আপনি পিতা মাতা বা যে কোন মুসলিম বা অলির কবর জিয়ারত করতে পারেন একাকী -এটাই সুন্নাহ- সম্মিলিতভাবে নয়।
সহিহ আমল কী হতে পারে?
তাহলে আমরা কী আমল করব?
* ক্ষমা চাওয়া:
যেহেতু আল্লাহ এই রাতে ক্ষমা করেন, তাই একাকী আল্লাহর কাছে তওবা করি।
* হিংসা ত্যাগ: কারও সাথে শত্রুতা থাকলে তা মিটিয়ে ফেলি।
* নফল ইবাদত: ব্যক্তিগতভাবে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত বা জিকির করতে পারি। তবে এটাকে 'ফরজ' বা 'ওয়াজিব' মনে করা যাবে না।
* পরদিন রোজা: ১৫ই শাবানের রোজার জন্য একক কোনো সহিহ হাদিস নেই,
শবে বরাত বা ১৫ই শাবানের রোজা নিয়ে হাদিস শাস্ত্রের বিশদ এবং দালিলিক ব্যাখ্যা
বিষয়টি বোঝার জন্য আমাদের দুটি ভিন্ন দিক লক্ষ্য করতে হবে:
১. ১৫ই শাবানের নির্দিষ্ট রোজার হাদিস (যঈফ বা দুর্বল)
ইবনে মাজাহ শরীফে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
"যখন নিসফু শাবান বা ১৫ই শাবানের রাত আসে, তখন তোমরা রাতে কিয়াম (ইবাদত) করো এবং দিনে রোজা রাখো..." (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)
দালিলিক ব্যাখ্যা:
মুহাদ্দিসগণের (হাদিস বিশারদ) মতে, এই হাদিসটির সনদ 'যঈফ' বা অত্যন্ত দুর্বল। এই হাদিসের বর্ণনাকারী সূত্রে 'আবু বকর ইবনে আবি সাবরা' নামক একজন ব্যক্তি আছেন, যাকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইবনে মাঈনসহ বড় বড় হাদিস বিশারদগণ 'মিথ্যাবাদী' বা 'হাদিস জালকারী' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাই এককভাবে শুধু ১৫ই শাবানের রোজাকে সুন্নাত বা আবশ্যক মনে করার শক্তিশালী কোনো সহিহ ভিত্তি নেই।
তবে আইয়ামে বিজের (১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) রোজা হিসেবে আপনি ১৫ তারিখ রোজা রাখতে পারেন।
এখন প্রশ্ন আসে, শবে বরাতের রোজা নিয়ে সঠিক আমল কোনটি?
আমাদের সমাজে ১৫ই শাবানের একটি রোজার যে বিশেষ প্রচলন আছে, তার ভিত্তি মূলত ইবনে মাজাহ-র একটি হাদিস (হাদিস নং-১৩৮৮)। তবে মুহাদ্দিসগণের মতে, এই নির্দিষ্ট হাদিসটির সনদ অত্যন্ত দুর্বল বা যঈফ।
তাহলে কি আমরা রোজা রাখব না? অবশ্যই রাখবেন, তবে তার সহিহ ভিত্তি হলো দুটি:
* শাবানের সাধারণ রোজা:
সহিহ বুখারীর ১৯৭০ নম্বর হাদিসটি (শাবান মাসের রোজা সম্পর্কে
> "عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لَا يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لَا يَصُومُ، فَمَا رَأَيْتُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلَّا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ"
আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
> "রাসূলুল্লাহ (সা.) (নফল) রোজা পালন করতে থাকতেন, এমনকি আমরা বলতাম যে, তিনি হয়তো আর রোজা ছাড়বেন না। আবার তিনি রোজা ভঙ্গ করতেন (বিরতি দিতেন), এমনকি আমরা বলতাম যে, তিনি হয়তো আর রোজা রাখবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো পূর্ণ মাস রোজা পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে বেশি রোজা তাঁকে অন্য কোনো মাসে পালন করতে দেখিনি।" (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯৭০)
১. এটি সরাসরি সহিহ বুখারীর হাদিস।
২. এটি প্রমাণ করে যে, ১৫ই শাবান বা শবে বরাতকে কেন্দ্র করে শুধু একদিন রোজা রাখা নয়, বরং পুরো শাবান মাস জুড়েই বেশি বেশি রোজা রাখা সুন্নাহ।
হাদিস অনুযায়ী, রাসূল (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। তাই আপনিও এই মাসে বেশি রোজা রাখতে পারেন।
* আইয়ামে বিজের রোজা: রাসূল (সা.) প্রতি মাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে রোজা রাখতে উৎসাহিত করেছেন (তিরমিজি: ৭৬১)। যেহেতু ১৫ই শাবান এই আইয়ামে বিজের অন্তর্ভুক্ত, তাই এই উদ্দেশ্যে রোজা রাখা একটি চমৎকার সুন্নাহ।
তবে"রোজাকে আবশ্যক মনে করবেন না"।
: অর্থাৎ, আমরা রোজা রাখব সুন্নাহর সাধারণ নিয়মে, শুধু এই রাতকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ 'আবশ্যক' ইবাদত হিসেবে নয়।
"সতর্কতা: ১৫ই শাবানের রোজাকে ফরজের মতো মনে করা কিংবা এই একটি রোজা হাজার বছরের রোজার সমান—এমন বিশ্বাস রাখা থেকে বিরত থাকুন। কারণ ইসলামে অতিরঞ্জনের স্থান নেই।"
ইসলাম মানেই হলো ভারসাম্য। অতিরঞ্জন বা অবহেলা—কোনোটিই কাম্য নয়। আসুন,
আমরা শিরক ও হিংসা মুক্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং সুন্নাহ মেনে জীবন গড়ি। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন