আস্তিক বনাম নাস্তিক

সোলাপুরের সেই ঐতিহাসিক বিতর্কে জাভেদ আখতারের উত্থাপন করা নাস্তিক্যবাদী প্রশ্নগুলোর বিপরীতে মুফতি শামাইল নদভী অত্যন্ত যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক উত্তর দিয়েছিলেন। নিচে প্রধান প্রশ্ন ও উত্তরগুলো তুলে ধরা হলো: ১. প্রশ্ন: স্রষ্টা যদি থাকেন, তবে তাঁকে কেন দেখা যায় না? কেন কোনো প্রমাণ নেই? জাভেদ আখতারের যুক্তি: যা দেখা যায় না বা ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করা যায় না, তা বিশ্বাস করা যুক্তিসঙ্গত নয়। মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব একে ‘ভুল সরঞ্জামের ব্যবহার’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন: * আপনি যদি ‘মেটাল ডিটেক্টর’ দিয়ে প্লাস্টিক খুঁজতে যান, তবে তা খুঁজে পাবেন না। এর মানে এই নয় যে প্লাস্টিক নেই; বরং এর মানে হলো আপনি ভুল সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন। * স্রষ্টা কোনো ‘বস্তু’ নন যে তাঁকে বৈজ্ঞানিক ল্যাবে মাপা যাবে। তিনি এই মহাবিশ্বের ঊর্ধ্বে। আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় এবং বুদ্ধি সীমাবদ্ধ, আর স্রষ্টা অসীম। সীমাবদ্ধ জিনিস দিয়ে অসীমকে সরাসরি ধরা সম্ভব নয়। ২. প্রশ্ন: পৃথিবীতে কেন এত দুঃখ, কষ্ট এবং শিশুদের মৃত্যু হয়? (Problem of Evil) জাভেদ আখতারের যুক্তি: স্রষ্টা যদি দয়ালু হন, তবে কেন বিশ্বে নিষ্পাপ শিশুরা মারা যায় বা মানুষ জুলুমের শিকার হয়? মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: তিনি বলেন, এটি একটি ‘আবেগীয় যুক্তি’ (Emotional Argument), যৌক্তিক নয়। * পরীক্ষার ক্ষেত্র: এই পৃথিবী কোনো জান্নাত বা চূড়ান্ত আরামের জায়গা নয়; এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। পরীক্ষার হলে যেমন কিছু প্রশ্ন কঠিন হয়, জীবনের কষ্টগুলোও তেমন পরীক্ষার অংশ। * অসম্পূর্ণ দৃশ্য: আমরা একটি বিশাল ছবির ছোট একটি অংশ দেখি। একজন ডাক্তার যখন রোগীর অপারেশন করেন, তখন বাইরে থেকে মনে হতে পারে তিনি জুলুম করছেন। কিন্তু পুরো বিষয়টির পেছনে একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্য বা ‘উইজডম’ (Wisdom) থাকে। স্রষ্টার পরিকল্পনার সবকিছু মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। ৩. প্রশ্ন: স্রষ্টা ছাড়া কি মহাবিশ্ব নিজে নিজে হতে পারে না? জাভেদ আখতারের যুক্তি: বিগ ব্যাং বা বিজ্ঞানের মাধ্যমে তো অনেক কিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে স্রষ্টার প্রয়োজন কোথায়? মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব ‘গোলাপি বলের’ উদাহরণ দেন। * তিনি বলেন, একটি দ্বীপে যদি আপনি হুট করে একটি ছোট বলও পড়ে থাকতে দেখেন, তবে আপনার বিবেক বলবে এটি কেউ না কেউ তৈরি করেছে। * যদি একটি সামান্য বল নিজে নিজে হতে না পারে, তবে এত সুশৃঙ্খল এবং নিখুঁত মহাবিশ্ব (যেখানে সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র নির্দিষ্ট নিয়মে চলে) কোনো ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা স্রষ্টা ছাড়া কীভাবে সম্ভব? বিজ্ঞান শুধু ‘কীভাবে’ হচ্ছে তা বলে, কিন্তু ‘কেন’ এবং ‘কার মাধ্যমে’ হচ্ছে তার উত্তর দেয় না। ৪. প্রশ্ন: যদি সবকিছু আগেই নির্ধারিত হয়, তবে দোয়া বা প্রার্থনা কেন? জাভেদ আখতারের যুক্তি: যদি ভাগ্য বা তকদিরে সব লেখা থাকে, তবে দোয়া করে কি লাভ? স্রষ্টা কি তাঁর সিদ্ধান্ত বদলান? মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব ব্যাখ্যা করেন যে, দোয়া বা প্রার্থনাও সেই ভাগ্য বা ব্যবস্থারই অংশ। * স্রষ্টা দোয়া করাকে একটি ইবাদত হিসেবে রেখেছেন। মানুষ যখন দোয়া করে, তখন সে স্বীকার করে যে সে অসহায় এবং একজন শক্তিমান সত্তার সাহায্য প্রয়োজন। * দোয়া এবং চেষ্টার মাধ্যমেই ফলাফল অর্জিত হয়—এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থার নাম। উপসংহার: মুফতি শামাইল নদভীর উত্তরের মূল কৌশল ছিল জাভেদ আখতারের প্রশ্নগুলোকে শুধুমাত্র ধর্মতত্ত্ব দিয়ে নয়, বরং সাধারণ যুক্তি (Logic) এবং দর্শন (Philosophy) দিয়ে খণ্ডন করা। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মানেই স্রষ্টার অনুপস্থিতি নয়। সোলাপুরের সেই বিতর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং সূক্ষ্ম যুক্তি বিনিময় হয়েছিল যা আগের আলোচনায় আসেনি। মুফতি শামাইল নদভী যেভাবে জাভেদ আখতারের দার্শনিক আক্রমণগুলো সামলেছেন, তার আরও কিছু অংশ নিচে দেওয়া হলো: ৪. অন্ধবিশ্বাস বনাম যুক্তি (Blind Faith vs Rationalism) জাভেদ আখতারের দাবি: ধর্ম কেবল পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া একটি অন্ধবিশ্বাস। মানুষ যুক্তি ছেড়ে ঐতিহ্যের পেছনে ছোটে। মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব বলেন যে, ইসলাম অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং পবিত্র কোরআন বারবার মানুষকে 'আকল' বা বুদ্ধি ব্যবহার করতে এবং প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে। তিনি বলেন: * নাস্তিক্যবাদও এক ধরণের 'বিশ্বাস'। কারণ নাস্তিকরা প্রমাণ করতে পারে না যে স্রষ্টা নেই, তারা কেবল 'বিশ্বাস' করে যে তিনি নেই। * অন্যদিকে, মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা দেখে একজন আস্তিক যৌক্তিকভাবেই স্রষ্টার অস্তিত্বের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তাই এটি অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং যৌক্তিক উপসংহার। ৫. নৈতিকতার উৎস (Source of Morality) জাভেদ আখতারের যুক্তি: ভালো মানুষ হওয়ার জন্য ধর্মের প্রয়োজন নেই। একজন নাস্তিকও নীতিবান হতে পারে। মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব এখানে একটি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন: * যদি স্রষ্টা না থাকেন এবং মানুষ কেবল বিবর্তনের ফলে আসা উন্নত প্রাণী হয়, তবে 'ভালো' বা 'মন্দের' কোনো চিরন্তন মানদণ্ড থাকে না। আজ যা ভালো, কাল তা মন্দ হতে পারে। * কিন্তু ধর্ম নৈতিকতাকে একটি স্থায়ী ভিত্তি দেয়। স্রষ্টা আছেন বলেই ন্যায়ের বিচার হবে—এই বিশ্বাস মানুষকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নীতিবান হতে বাধ্য করে। স্রষ্টা না থাকলে নৈতিকতা কেবল মানুষের সুবিধার একটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। ৬. 'ফাইন টিউনিং' বা নিখুঁত বিন্যাস মুফতি শামাইল নদভীর যুক্তি: তিনি মহাবিশ্বের গাণিতিক নিখুঁততার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন: * পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ যদি ১% এদিক-সেদিক হতো, তবে আমরা মারা যেতাম। মাধ্যাকর্ষণ বল যদি সামান্য বেশি হতো, তবে পৃথিবী চ্যাপ্টা হয়ে যেত। * এটি কি কাকতালীয়? একটি বইয়ের কারখানায় বিস্ফোরণ হলে কি একটি নিখুঁত অভিধান তৈরি হতে পারে? অসম্ভব। তেমনি এই মহাবিশ্বের নিখুঁত টিউনিং প্রমাণ করে যে এর পেছনে একজন 'পারফেক্ট ডিজাইনার' আছেন। ৭. বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও গায়ব (Unseen) জাভেদ আখতারের যুক্তি: বিজ্ঞান যা প্রমাণ করতে পারে না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: মুফতি সাহেব বলেন, বিজ্ঞান সবসময় পরিবর্তনশীল। ১০০ বছর আগে বিজ্ঞান যা জানত না, আজ তা জানে। তার মানে এই নয় যে ১০০ বছর আগে সেই জিনিসগুলোর অস্তিত্ব ছিল না। * বিজ্ঞান শুধু 'বস্তু' (Matter) নিয়ে কাজ করে। কিন্তু চেতনা (Consciousness), ভালোবাসা বা আত্মার মতো বিষয়গুলো বিজ্ঞানের আওতার বাইরে। স্রষ্টা যেহেতু বস্তু নন, তাই বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে স্রষ্টাকে বিচার করা ভুল। বিতর্কের শেষ কথা মুফতি শামাইল নদভী তাঁর বক্তব্যে জাভেদ আখতারকে একটি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন: "আপনি স্রষ্টা নেই তা প্রমাণ করতে পারবেন না, বড়জোর বলতে পারেন যে আপনি তাঁকে খুঁজে পাননি।" পুরো বিতর্কে মুফতি সাহেব প্রমাণ করেছেন যে, নাস্তিকতা মূলত প্রমাণের অভাব নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। তিনি অত্যন্ত নম্রভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, আধুনিকতা মানেই ধর্ম ত্যাগ করা নয়, বরং ধর্মকে যুক্তির আলোয় বোঝা। সোলাপুরের সেই বিতর্কে সময়ের ধারণা (Concept of Time) এবং "আল্লাহর আগে কী ছিল" বা "স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করেছেন"—এই অতি প্রাচীন ও জটিল প্রশ্নটি নিয়ে জাভেদ আখতার এবং মুফতি শামাইল নদভীর মধ্যে অত্যন্ত গভীর আলোচনা হয়েছিল। মুফতি শামাইল নদভী এই প্রশ্নের উত্তরটি যেভাবে যৌক্তিকভাবে দিয়েছিলেন, তার মূল নির্যাস নিচে দেওয়া হলো: ১. জাভেদ আখতারের প্রশ্ন: স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করেছেন? জাভেদ আখতার সাধারণত নাস্তিকদের একটি ক্লাসিক যুক্তি তুলে ধরেন: "যদি প্রতিটি জিনিসের একজন সৃষ্টিকর্তা থাকে, তবে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্তা কে? আর তাঁর আগে কী ছিল?" ২. মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: "অসীম প্রত্যাগমন" বা Infinite Regress মুফতি সাহেব এই প্রশ্নের উত্তরে দর্শনের একটি মৌলিক নিয়ম ব্যবহার করেন। তিনি বলেন: * যদি আমরা বলি স্রষ্টাকে অন্য কেউ সৃষ্টি করেছেন, তবে প্রশ্ন আসবে তাকে কে সৃষ্টি করেছেন? এভাবে এই ধারা চিরকাল চলতে থাকবে (যাকে দর্শনে Infinite Regress বলা হয়)। * যদি এই ধারা শেষ না হয়, তবে কোনো কিছুই কখনো অস্তিত্বে আসত না। উদাহরণস্বরূপ: একজন সৈনিক ততক্ষণ গুলি চালাবে না যতক্ষণ না তার উপরের অফিসার নির্দেশ দেয়। এখন উপরের অফিসার যদি তার উপরের অফিসারের অনুমতির অপেক্ষায় থাকে এবং এভাবে যদি অফিসারের সংখ্যা অসীম হয়, তবে কখনোই গুলি চালানো হবে না। * যেহেতু মহাবিশ্ব অস্তিত্বে আছে, তার মানে এই ধারার শুরুতে এমন একজন আছেন যিনি 'স্বয়ম্ভু' (যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি)। তিনিই আল্লাহ। ৩. সময় (Time) সম্পর্কিত যুক্তি "আল্লাহর আগে কী ছিল"—এই প্রশ্নের জবাবে মুফতি সাহেব বিজ্ঞানের আলোকে একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দেন: * সময় নিজেই একটি সৃষ্টি: মুফতি সাহেব বলেন, আধুনিক বিজ্ঞান (আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি) অনুযায়ী সময় (Time) এবং স্থান (Space) মহাবিশ্ব সৃষ্টির সাথে সাথে তৈরি হয়েছে। * স্রষ্টা সময়ের উর্ধ্বে: স্রষ্টা যেহেতু মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি সময় এবং স্থানের স্রষ্টা। যিনি সময় সৃষ্টি করেছেন, তিনি সময়ের ফ্রেমে বন্দী নন। * 'আগে' বা 'পরে' শব্দের সীমাবদ্ধতা: 'আগে' বা 'পরে' শব্দগুলো শুধুমাত্র তখনই অর্থবহ যখন 'সময়' বিদ্যমান থাকে। স্রষ্টা যেহেতু সময়ের ঊর্ধ্বে, তাই তাঁর ক্ষেত্রে "আগে কী ছিল" এই প্রশ্নটিই টেকনিক্যালি ভুল। এটি এমন একটি প্রশ্ন যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। > ৪. গাণিতিক উদাহরণ (The Number One) তিনি বিষয়টি আরও সহজ করতে সংখ্যার উদাহরণ দেন। * আমরা যদি গণনা শুরু করি— ১, ২, ৩, ৪...। এখানে ২-এর আগে ১ আছে, ৩-এর আগে ২ আছে। কিন্তু আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন "১-এর আগে কোন সংখ্যা আছে (স্বাভাবিক গণনার ক্ষেত্রে)?" উত্তর হবে—কিছুই না। ১ থেকেই গণনার শুরু। * তেমনিভাবে, আল্লাহ হচ্ছেন 'আল-আউয়াল' (সর্বপ্রথম)। তাঁর আগে কিছুই ছিল না এবং তাঁর কোনো শুরু নেই। ৫. চূড়ান্ত যুক্তি: 'খালিক' (সৃষ্টিকর্তা) বনাম 'মাখলুক' (সৃষ্টি) মুফতি সাহেব বলেন, আমরা স্রষ্টাকে আমাদের মতো 'সৃষ্টি' বা মাখলুক হিসেবে চিন্তা করি বলেই এই প্রশ্নটি জাগে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞা হচ্ছে—তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি চিরঞ্জীব। যদি তাঁকে কেউ সৃষ্টি করত, তবে তিনি আর 'খোদা' থাকতেন না, তিনিও একজন 'সৃষ্টি' হয়ে যেতেন। উপসংহার: মুফতি শামাইল নদভী প্রমাণ করেন যে, স্রষ্টার কোনো সৃষ্টিকর্তা থাকা যৌক্তিকভাবে অসম্ভব। কারণ এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে শুরুতে এমন একজন 'অপরিহার্য সত্তা' (Necessary Being) আছেন, যার কোনো শুরু বা শেষ নেই। তকদির (ভাগ্য) এবং মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে মুফতি সাহেবের দেওয়া উত্তর সমূহ তকদির (ভাগ্য) এবং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (Free Will) নিয়ে নাস্তিকদের করা কঠিন প্রশ্নগুলোর জবাবে মুফতি শামাইল নদভী অত্যন্ত চমৎকার ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। জাভেদ আখতারের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর উত্তরের মূল পয়েন্টগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: ১. জাভেদ আখতারের প্রশ্ন (The Conflict): নাস্তিকদের সাধারণ প্রশ্ন হলো—যদি স্রষ্টা সব জানেন এবং সবকিছু যদি তাঁর তকদিরে লেখাই থাকে, তবে মানুষ কেন দায়ী হবে? অথবা মানুষ কি কেবল রোবটের মতো কাজ করছে? যদি সবকিছু নির্ধারিতই থাকে, তবে বিচার বা পরকালের সার্থকতা কী? ২. মুফতি শামাইল নদভীর উত্তর: ক. স্রষ্টার জ্ঞান বনাম বাধ্যবাধকতা (Knowledge vs. Compulsion): মুফতি সাহেব ব্যাখ্যা করেন যে, স্রষ্টা আগে থেকে জানেন আমরা কী করব, তার মানে এই নয় যে তিনি আমাদের জোর করছেন সেটা করার জন্য। * উদাহরণ: একজন দক্ষ শিক্ষক একজন ছাত্রের মেধা দেখে আগেই বলে দিতে পারেন যে এই ছাত্রটি পরীক্ষায় ভালো করবে আর ওই ছাত্রটি ফেল করবে। শিক্ষকের এই জ্ঞান ছাত্রটিকে ফেল করতে বাধ্য করে না; বরং ছাত্রটি নিজের আলস্যের কারণেই ফেল করে। স্রষ্টা যেহেতু সময়ের ঊর্ধ্বে, তাই তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ জানেন, কিন্তু কাজটা করার স্বাধীনতা আমাদেরই দিয়েছেন। খ. সীমিত স্বাধীনতা (Delegated Free Will): মুফতি সাহেব বলেন, আল্লাহ মানুষকে দুটি 영역 বা ক্ষেত্র দিয়েছেন: ১. যেখানে মানুষের হাত নেই: যেমন—আমার জন্ম কোথায় হবে, আমার গায়ের রঙ কী হবে, বা আমার মৃত্যু কখন হবে। এসব ক্ষেত্রে মানুষের কোনো জবাবদিহিতা নেই। ২. যেখানে মানুষের ইচ্ছা আছে: যেমন—আমি কি চুরি করব নাকি দান করব? আমি কি সত্য বলব নাকি মিথ্যা? এই ভালো-মন্দের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন এবং শুধুমাত্র এই 'ইচ্ছাশক্তির' ব্যবহারের জন্যই মানুষের বিচার হবে। গ. পরীক্ষার হল (The Examination Hall): তিনি বলেন, জীবন একটি পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে শিক্ষক প্রশ্নপত্র দিয়ে দেন এবং ছাত্রকে উত্তর লেখার স্বাধীনতা দেন। শিক্ষক জানেন কে পাশ করবে আর কে ফেল করবে, কিন্তু তিনি ছাত্রের কলম ধরে লিখে দেন না। তকদির হলো স্রষ্টার সেই মহাপরিকল্পনা বা জ্ঞান, কিন্তু মানুষের কাজ হলো তার নিজস্ব ইচ্ছা অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করা। ঘ. দোয়া এবং চেষ্টার ভূমিকা: জাভেদ আখতার যখন প্রশ্ন করেন যে, তকদিরে থাকলে দোয়া করার প্রয়োজন কী? মুফতি সাহেব উত্তরে বলেন যে, দোয়া করা এবং চেষ্টা করা—উভয়ই তকদিরের অংশ। আল্লাহ হয়তো তকদিরে লিখে রেখেছেন যে "অমুক ব্যক্তি যদি দোয়া করে বা চেষ্টা করে তবেই সে এই জিনিসটি পাবে।" সুতরাং চেষ্টা এবং দোয়া বাদ দিয়ে তকদিরের ওপর বসে থাকাটা ভুল। ৩. উপসংহার (The Conclusion): মুফতি শামাইল নদভী প্রমাণ করেন যে, তকদির মানে মানুষের হাত-পা বেঁধে রাখা নয়। বরং এটি স্রষ্টার এক অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডার। আল্লাহ মানুষকে বিবেক দিয়েছেন ভালো-মন্দের তফাৎ করার জন্য। মানুষ রোবট নয়, বরং তার কর্মের জন্য সে নিজেই দায়ী।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিমান দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু ও ইসলাম।

একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য (অন লাইন বা অফ লাইনে)কি কি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত।

মুসলিম উম্মাহ কি জাতি সংঘের মানবাধিকার অনুসরণ করবে নাকি কোরআন সুন্নাহ বর্ণিত মানবাধিকার?