স্বার্থের জায়গায় নীতি কাজ করে না।


 আচ্ছলামু আলাইকুম 

প্রিয় পাঠক!

এটি একটি গভীর বিষয়। স্বার্থ এবং নীতির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব মানব ইতিহাসের একটি চিরন্তন বাস্তবতা, যা প্রায়শই ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অস্থিরতা তৈরি করে। স্বার্থের জায়গায় নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বিজ্ঞান এবং কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো।

বিজ্ঞানের আলোকে স্বার্থ ও নীতি

মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, মানব আচরণ মূলত দুটি প্রধান শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়: স্বার্থ (self-interest) এবং সামাজিক সহযোগিতা (social cooperation)।

 * বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ:

 বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের জন্য স্বার্থপর আচরণ একসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন, খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা বা বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা। এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।

 * নিউরোসায়েন্স: 

মস্তিষ্কের স্ক্যানিং-এর মাধ্যমে দেখা গেছে যে, যখন আমরা নিজের লাভের কথা ভাবি, তখন মস্তিষ্কের যে অংশগুলো সক্রিয় হয়, তা নীতির কথা ভাবার সময় সক্রিয় হওয়া অংশগুলো থেকে ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে, তাৎক্ষণিক লাভের আকাঙ্ক্ষা নীতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে।

 * অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান:

 আধুনিক অর্থনীতিতে 'যুক্তিসঙ্গত স্বার্থপরতা' (rational self-interest) একটি মৌলিক ধারণা। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে, মানুষ সবসময় তার নিজের লাভ maximize করতে চায়। এই ধারণাটি অনেক সময় নীতির বিপরীত দিকে কাজ করে। যখন একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান দেখে যে, কোনো নীতি অনুসরণ করলে তার আর্থিক ক্ষতি হবে, তখন সে নীতি ভঙ্গ করার প্রলোভন অনুভব করে।

তবে বিজ্ঞান এটাও দেখায় যে, মানুষ কেবল স্বার্থপর প্রাণী নয়। সামাজিক প্রবৃত্তি, যেমন সহানুভূতি, সহযোগিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা, আমাদের টিকে থাকার জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মস্তিষ্ক সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য পুরস্কৃত হয়। অর্থাৎ, নীতির প্রতি আনুগত্য এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখানোও আমাদের মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে স্বার্থ ও নীতি

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট এবং নৈতিক দিক থেকে সুসংজ্ঞায়িত। ইসলামে, নীতির ধারণাটি আল্লাহ্‌র বিধান এবং তাঁর সন্তুষ্টির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

 * স্বার্থ হলো নাফসের প্রলোভন: ইসলামে, ব্যক্তিগত বা জাগতিক স্বার্থ প্রায়শই 'নাফসে আম্মারাহ' (প্রবৃত্তির বশীভূত আত্মা) দ্বারা সৃষ্ট প্রলোভন হিসেবে বিবেচিত। এটি মানুষকে খারাপ কাজ, যেমন লোভ, হিংসা, দুর্নীতি এবং অন্যায় করতে উৎসাহিত করে।

 * নীতি হলো তাকওয়া ও ইহসান: নীতির মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া (আল্লাহকে ভয় করা) এবং ইহসান (সুন্দর ও সৎ কাজ করা)। যখন একজন মুমিন নীতি অনুসরণ করে, তখন সে আসলে আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালন করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে। এটি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের চেয়ে অনেক বড় লক্ষ্য।

 * কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ্‌ তা'আলা কুরআনে বারবার নীতির উপর অটল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন, তিনি বলেছেন, "হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে।" (সূরা মা'ইদাহ, ৫:৮)। এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, এমনকি চরম বিদ্বেষ বা অপছন্দের পরিস্থিতিতেও নীতি ও ন্যায়বিচারের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। এটি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে নীতিকে স্থাপন করে।

 * সুন্নাহর উদাহরণ: রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবন ছিল নীতির সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। তিনি কখনোই ব্যক্তিগত লাভ বা সুবিধা অর্জনের জন্য ইসলামের মৌলিক নীতিগুলো থেকে সরে আসেননি। এমনকি তাঁর শত্রুদের প্রতিও তিনি ন্যায়বিচার করতেন। তাঁর একটি প্রসিদ্ধ হাদীস হলো, "তোমাদের মধ্যে উত্তম সে ব্যক্তি, যে চরিত্র ও আচরণে উত্তম।" (বুখারী ও মুসলিম)। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, একজন মুসলিমের মর্যাদা তার ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা দিয়ে নয়, বরং তার নীতি ও সততা দিয়ে নির্ধারিত হয়।

উপসংহার

বিজ্ঞান দেখায় যে, মানুষের মস্তিষ্কে স্বার্থপরতা ও নীতিবোধ উভয়ই বিদ্যমান এবং তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু ইসলাম চূড়ান্ত সমাধান দেয়। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে, নীতি হলো আল্লাহ্‌র নির্দেশিত পথ, যা জাগতিক ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। একজন প্রকৃত মুমিন নীতিকে নিজের জীবনের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে, কারণ সে জানে যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের চেয়ে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অনেক বড় সাফল্য। তাই, যদিও স্বার্থ অনেক সময় নীতিকে দুর্বল করতে চায়, একজন মুমিনের ঈমান তাকে নীতির পথে অটল থাকতে সাহায্য করে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিমান দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু ও ইসলাম।

একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য (অন লাইন বা অফ লাইনে)কি কি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত।

মুসলিম উম্মাহ কি জাতি সংঘের মানবাধিকার অনুসরণ করবে নাকি কোরআন সুন্নাহ বর্ণিত মানবাধিকার?