মূল মিশন কি? কোরআন বর্ণিত ২৫ জন নবী প্রেরণের
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
প্রিয় পাঠক
!
আশা করি আপনারা সকলেই
আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন
আজকে আমরা কোরআনে বর্ণিত
সকল নবীদের মূল উদ্দেশ্য ,
মূল মিশন কি ছিল এই বিষয় নিয়ে
আলোচনা করব।
আমরা জানি আল্লাহ তাআলা
কোরআনে বর্ণিত ২৫ জন নবীকে
মানব জাতির হেদায়তের জন্য এবং
আল্লাহর পথে আহ্বান করার জন্য
তাদেরকে প্রেরণ করেছেন ।
যদিও প্রতিটি নবীর সময়, স্থান ও পরিস্থিতির ভিন্নতা ছিল, তাদের সবার দাওয়াতের মূল বিষয়গুলো ছিল এক ও অভিন্ন। তাদের প্রধান মিশনগুলোর সারসংক্ষেপ
১. তাওহিদের দাওয়াত (এক আল্লাহর একত্ব): সকল নবীর প্রধান মিশন ছিল মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানানো। তারা মানুষকে মূর্তি পূজা, প্রকৃতি পূজা, বা অন্য কোনো মানুষের উপাসনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং কেবল এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
২. আখিরাতের বিশ্বাস: নবী-রাসূলগণ মানুষকে এই বিষয়ে সতর্ক করেছেন যে, দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর পরকালীন জীবনে তাদের প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে। তারা জান্নাতের সুসংবাদ এবং জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন, যাতে মানুষ সৎ পথে চলে।
৩. নীতি ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা: নবীরা মানুষকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং নৈতিক জীবন যাপনের শিক্ষা দিয়েছেন। তারা সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সততা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উন্নত চরিত্রের আদর্শ স্থাপন করেছেন। হযরত শুয়াইব (আ.) তার জাতিকে ব্যবসায়িক লেনদেনে পরিমাপ ও ওজনে কারচুপি করতে নিষেধ করেছিলেন, যা এই মিশনের একটি উদাহরণ।
৪. আল্লাহর কিতাব ও শরিয়ত প্রচার: অনেক নবীর কাছে আল্লাহ কিতাব বা আসমানি সহিফা নাজিল করেছেন। নবীরা সেই কিতাবের মাধ্যমে আল্লাহর আইন-কানুন ও বিধি-বিধান মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, যাতে তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে পারে।
৫. মানুষকে কুসংস্কার ও অন্যায় থেকে মুক্তি দেওয়া: নবীরা তাদের নিজ নিজ সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন কুসংস্কার, জুলুম, ব্যভিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তারা মানুষকে এসব পাপ থেকে ফিরিয়ে এনে একটি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে কাজ করেছেন। যেমন, হযরত লুত (আ.) তার সমকামী জাতির বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছিলেন।
এই মিশনগুলো ছিল সকল নবীর দাওয়াতের মূল ভিত্তি। তবে কিছু নবীর ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট জাতির জন্য বিশেষ কিছু নির্দেশনা ছিল, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন ছিল। কিন্তু তাদের সবার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যে ফিরিয়ে আনা।
কোরআনে উল্লেখিত ২৫ জন নবীর নাম এবং তাদের সম্পর্কিত কিছু তথ্য
১. হযরত আদম (আ.): পৃথিবীর প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবী। তার কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতি ছিল না, কারণ তিনি মানবজাতির আদি পিতা।
২. হযরত ইদ্রিস (আ.): প্রথম কলমের ব্যবহারকারী এবং বস্ত্র সেলাইয়ের পদ্ধতির উদ্ভাবক। তিনি মূলত ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলে দাওয়াত দিয়েছেন।
৩. হযরত নূহ (আ.): তিনি তার সম্প্রদায়ের কাছে সাড়ে নয়শো বছর দাওয়াত দিয়েছেন। তার জাতি ছিল 'বনি নূহ', এবং তারা ইরাকের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে বসবাস করত।
৪. হযরত হুদ (আ.): 'আদ' জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন। এই জাতি আম্মান থেকে শুরু করে ইয়ামেন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
৫. হযরত সালেহ (আ.): 'সামুদ' জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন। এই জাতি মাদায়েন এবং হিজর অঞ্চলে বসবাস করত, যা বর্তমান সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত।
৬. হযরত ইব্রাহিম (আ.): তিনি ইরাকের উর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ফিলিস্তিন ও মক্কায় বসবাস করেছেন। তাকে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মের 'আদি পিতা' বলা হয়।
৭. হযরত লুত (আ.): হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ভাতিজা। তিনি ফিলিস্তিনের সাদুম (Sodom) অঞ্চলের লোকদের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন।
৮. হযরত ইসমাইল (আ.): হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রথম পুত্র। তিনি আরব জাতি, বিশেষ করে মক্কার 'বনি জুরহুম' গোত্রের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন।
৯. হযরত ইসহাক (আ.): হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দ্বিতীয় পুত্র। তিনি ফিলিস্তিনের কেনান অঞ্চলে দাওয়াত দিয়েছেন এবং বনি ইসরাঈল জাতির আদি পিতা।
১০. হযরত ইয়াকুব (আ.): হযরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র। তিনি ফিলিস্তিন ও সিরিয়া অঞ্চলে বসবাস করতেন। তার আরেক নাম ছিল 'ইসরাঈল', যার থেকে 'বনি ইসরাঈল' জাতির নামকরণ হয়েছে।
১১. হযরত ইউসুফ (আ.): হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র। তিনি মিশরে রাজত্ব লাভ করেছিলেন এবং তার দাওয়াত ছিল মূলত মিশরীয়দের জন্য।
১২. হযরত আইয়ুব (আ.): তিনি বনি ইসরাঈল বংশের একজন নবী ছিলেন এবং বর্তমান জর্ডান অঞ্চলে বসবাস করতেন।
১৩. হযরত শুয়াইব (আ.): তিনি 'আহলে মাদায়েন' (মাদায়েনের অধিবাসী) এবং 'আহলে আইকাহ' (আইকার অধিবাসী) সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন, যা বর্তমান সৌদি আরবের মাদায়েন অঞ্চলে ছিল।
১৪. হযরত মুসা (আ.): বনি ইসরাঈল জাতির জন্য প্রেরিত এক মহান নবী। তিনি মিশরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তার দাওয়াত ছিল ফেরাউন ও তার জাতির জন্য।
১৫. হযরত হারুন (আ.): হযরত মুসা (আ.)-এর ভাই। তিনিও বনি ইসরাঈল জাতির জন্য মুসা (আ.)-এর সঙ্গী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন।
১৬. হযরত দাউদ (আ.): বনি ইসরাঈল জাতির রাজা এবং নবী। তিনি বর্তমান ফিলিস্তিনের জেরুজালেম অঞ্চলে রাজত্ব করতেন।
১৭. হযরত সুলাইমান (আ.): হযরত দাউদ (আ.)-এর পুত্র। তিনিও বিলি ইসরাঈল জাতির রাজা ও নবী ছিলেন এবং জেরুজালেম থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।
১৮. হযরত ইলিয়াস (আ.): বনি ইসরাঈল জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন। তার কর্মস্থল ছিল বর্তমান লেবানন ও সিরিয়া অঞ্চলে।
১৯. হযরত আল-ইয়াসা' (আ.): হযরত ইলিয়াস (আ.)-এর উত্তরসূরী এবং বনি ইসরাঈল জাতির নবী।
২০. হযরত যুল-কিফ্ল (আ.): অনেকে তাকে হযরত আইয়ুব (আ.)-এর পুত্র বা অন্য কোনো নবী মনে করেন। তিনি বনি ইসরাঈল জাতির নবী ছিলেন।
২১. হযরত ইউনুস (আ.): তিনি ইরাকের নিনেভাহ (Ninevah) শহরে 'আশ-শাব' জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন।
২২. হযরত যাকারিয়া (আ.): বনি ইসরাঈল জাতির নবী। তিনি ফিলিস্তিনের জেরুজালেম অঞ্চলে থাকতেন।
২৩. হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ.): হযরত যাকারিয়া (আ.)-এর পুত্র। তিনিও বনি ইসরাঈল জাতির নবী এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে দাওয়াত দিয়েছেন।
২৪. হযরত ঈসা (আ.): বনি ইসরাঈল জাতির সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি ফিলিস্তিনের বাইতুল লাহম (Bethlehem) শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
২৫. হযরত মুহাম্মাদ (সা.): সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। তিনি আরব জাতি, বিশেষ করে মক্কার কুরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ
করেন এবং তার দাওয়াত সমগ্র মানবজাতির জন্য ছিল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন