শিশু শিক্ষার্থীকে শারীরিক শাস্তি ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান


  এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে 

•শিশু শিক্ষার্থী অপরাধ করলে 

•শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য শারীরিক শাস্তি 

•ইসলামে বেত্রাঘাতের মূলনীতি 

আধুনিক বিজ্ঞান ও শিক্ষা পদ্ধতি 

উপসংহার

শিক্ষার্থীরা অপরাধ করলে প্রথমে তাদের বুঝাতে হবে এবং ভৎর্সনা করতে হবে। এরপর শাস্তির ভয় দেখাতে হবে। এতেও সংশোধন না হ’লে মৃদুভাবে প্রহার করা যেতে পারে। তবে যখম হয় এমনভাবে প্রহার করা যাবে না এবং মুখে মারা যাবে না। সর্বাবস্থায় শাস্তির উদ্দেশ্য থাকবে শিক্ষার্থীকে সংশোধন করা, ব্যক্তিগত ক্রোধ বা হিংসার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো নয় (আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়া ৪৫/১৭০)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহর নির্দিষ্ট হদ সমূহের কোন হদ ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে দশবার বেত্রাঘাতের অধিক কোন শাস্তি নেই’ (বুখারী হা/৬৪৫৬; মুসলিম হা/১৭০৮)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা চাবুক (লাঠি বা বেত) ঐ জায়গায় লটকিয়ে রাখবে, যেখানে গৃহবাসীর দৃষ্টি পড়ে। কারণ এটা তাদের জন্য আদব শিক্ষাদানের মাধ্যম (ছহীহাহ হা/১৪৪৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৪০২১)। কতিপয় বিদ্বানের মতে, দশ বছরের নীচের শিশুদের লাঠি বা চাবুক দ্বারা শাসন করা যাবে না। কেননা হাদীছে দশ বছর হ’লেই কেবল ছালাতের জন্য প্রহারের কথা বলা হয়েছে, তৎপূর্বে নয় (মাওয়াহিবুল জালীল ১/৪১৩)। অতএব শিক্ষকগণকে নিত্য-নতুন কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষা দিতে হবে। প্রহার বা আঘাত করে শাসনের মানসিকতা দূর করে বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। কোন সময় পুরস্কার বা তিরস্কার এর মাধ্যমে তাকে উৎসাহিত করবে। চূড়ান্ত অবস্থা ব্যতীত কোনভাবেই প্রহারের পথ বেছে নেওয়া যাবে না (বিন বায, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৬/৪০৩)।

সুতরাং 

শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বেত্রাঘাত বা শারীরিক শাস্তি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। ইসলামে শিশুদের স্নেহ, মমতা এবং কোমলতার সঙ্গে লালন-পালনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, শিক্ষাদানের জন্য হালকা প্রহারের অনুমতি রয়েছে, কিন্তু এর কঠোর সীমা ও নিয়ম রয়েছে।

ইসলামে বেত্রাঘাতের মূলনীতি

 * প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে: রাসূল (সা.) শিশুদের নামাজের জন্য সাত বছর বয়সে আদেশ দিতে বলেছেন এবং দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে হালকা প্রহারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে এই প্রহারের উদ্দেশ্য হবে শুধুই শিক্ষা দেওয়া, শাস্তি বা ক্রোধ প্রকাশ করা নয়।

 * হালকা ও প্রতীকী: প্রহারের জন্য কোনো শক্ত বস্তু, যেমন লাঠি বা চাবুক ব্যবহার করা যাবে না। হাতে হালকাভাবে আঘাত করার কথা বলা হয়েছে।

 * নির্দিষ্ট সীমা: হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহর নির্ধারিত হদ (আইনি শাস্তি) ছাড়া দশবারের বেশি বেত্রাঘাত করা যাবে না। তবে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ শিশুদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিনবার হালকাভাবে আঘাত করার কথা বলেছেন।

 * নিষিদ্ধ স্থান: মুখে, মাথায় বা শরীরের কোনো সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এমন কোনো আঘাত দেওয়া যাবে না, যা চামড়া ফেটে যায়, হাড় ভাঙে বা শরীরে কোনো চিহ্ন রেখে যায়।

 * রাগ অবস্থায় নয়: রাগের মাথায় কোনো শিশুকে প্রহার করা যাবে না। যখন রাগ কমে যাবে, তখন ঠান্ডা মাথায় শাসনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 * অন্যান্য পদ্ধতি: প্রহারের আগে অন্যান্য নরম পদ্ধতি, যেমন বোঝানো, তিরস্কার করা, হালকা শাস্তি দেওয়া (যেমন খেলা বন্ধ করে দেওয়া), এসবের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যখন অন্য কোনো পদ্ধতি কাজ করবে না, কেবল তখনই প্রহারের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

আধুনিক বিজ্ঞান ও শিক্ষা পদ্ধতি

আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞান শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে অনেক গবেষণা করেছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক শাস্তি শিশুদের মনে ভয়, আতঙ্ক এবং মানসিক আঘাতের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে তারা মিথ্যা বলা বা অপরাধ লুকানোর চেষ্টা করতে পারে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং শিক্ষক বা অভিভাবকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়।

আধুনিক শিক্ষাবিদগণ শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে ইতিবাচক শিক্ষাদান পদ্ধতি, যেমন:

 * গঠনমূলক সমালোচনা ও প্রশংসা: ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা এবং ভুল হলে গঠনমূলক উপায়ে বুঝিয়ে বলা।

 * আচরণগত দিকনির্দেশনা: শিশুকে তার ভুলের কারণ সম্পর্কে সচেতন করা এবং সঠিক আচরণ শেখানো।

 * উদাহরণ স্থাপন: অভিভাবক বা শিক্ষক নিজেই ভালো আচরণের উদাহরণ হয়ে ওঠা।

উপসংহার

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শিশুদের শাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের সংশোধন করা, কোনো ক্ষতি করা নয়। ইসলামে শারীরিক শাস্তির অনুমতি থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত এবং কঠোর শর্তের অধীন। আধুনিক বিজ্ঞানও এই শাস্তির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছে। তাই, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের উচিত শারীরিক শাস্তিকে শেষ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা এবং তার আগে মমতা, ভালোবাসা, বোঝানো এবং ইতিবাচক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে শিশুকে সঠিক পথে পরিচালনা করা।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিমান দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু ও ইসলাম।

একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য (অন লাইন বা অফ লাইনে)কি কি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত।

মুসলিম উম্মাহ কি জাতি সংঘের মানবাধিকার অনুসরণ করবে নাকি কোরআন সুন্নাহ বর্ণিত মানবাধিকার?