আমেরিকা, ইসরাইল, জঙ্গিবাদ ও ইসলাম।
আচ্ছলামু আলাইকুম
আসুন, বিষয়টিকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করি:
প্রথম দৃষ্টিকোণ: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও মিডিয়ার বাস্তবতা
* সংজ্ঞা ও নামকরণ: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে, 'জঙ্গি' বা 'সন্ত্রাসবাদী' শব্দের সংজ্ঞা প্রায়শই রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যখন কোনো অ-রাষ্ট্রীয় মুসলিম গোষ্ঠী সশস্ত্রভাবে সংগ্রাম করে, তখন তাকে সাধারণত 'জঙ্গি' বা 'সন্ত্রাসবাদী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর কারণ হলো, এই ধরনের গোষ্ঠীগুলি প্রায়শই প্রেক্টিসিং মুসলিম হিসেবে ব্যাক্তিগত জীবন থেকে নিয়ে সংসদ পর্যন্ত সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ চর্চা করার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বা তাদের মিত্রদের স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যায়।
* রাষ্ট্রীয় বনাম অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি: ইসরায়েল এবং আমেরিকা রাষ্ট্রীয় শক্তি। আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের অনেক নিয়ম রাষ্ট্রীয় শক্তির জন্যই প্রযোজ্য। ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালায়, তখন তারা নিজেদের 'আত্মরক্ষার অধিকার' ব্যবহার করছে বলে দাবি করে। তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডকে 'যুদ্ধ' হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো, যেমন হামাস, রাষ্ট্রীয় শক্তি না হওয়ায় তাদের কর্মকাণ্ডকে 'সন্ত্রাসবাদ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
* মিডিয়ার ভূমিকা: পশ্চিমা বিশ্বে গণমাধ্যমগুলি প্রায়শই তাদের নিজস্ব সরকারের নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী খবর পরিবেশন করে। ফলে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে 'শান্তি প্রতিষ্ঠা' বা 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' হিসেবে তুলে ধরা হয়, এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধকে 'সন্ত্রাসবাদ' হিসেবে প্রচার করা হয়।
* ক্ষমতা ও প্রভাব: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যার ক্ষমতা বেশি, তার অবস্থানই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। আমেরিকা ও ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাদের এই ক্ষমতা তাদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে এবং তাদের সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতা
* জিহাদের শর্তাবলী: ইসলামে সশস্ত্র জিহাদের জন্য কঠোর শর্ত রয়েছে, অসামরিক ব্যক্তিদের হত্যা, সম্পদ ধ্বংস, বা বৃদ্ধ নারী শিশুকে হত্যা ইসলামে নিষিদ্ধ। কোনো মুসলিম গোষ্ঠী যদি ইসলামী নিয়ম মেনেও সশস্ত্র জিহাদ করে, কিন্তু যদি তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে অ-রাষ্ট্রীয় সহিংসতা হয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে তা 'সন্ত্রাসবাদ' হিসেবে বিবেচনা করতে চাই যা সম্পূর্ণ ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান।
* যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও অসামরিক ব্যক্তিদের ওপর হামলা করা, বসতি স্থাপন করা, বা মানবিক সহায়তা আটকে রাখা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ বারবার উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ইসরায়েলের এসব কর্মকাণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
* আমেরিকার ভূমিকা: কুখ্যাত মানবতার ফেরিওয়ালা আমেরিকা যখন সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন করে, তখন তারা পরোক্ষভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকেও সমর্থন করে যাচ্ছে ।
সুতরাং মুসলিম উম্মাহর কোনো গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে 'জঙ্গিবাদ' হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, একই ধরনের কর্মকাণ্ড ইসরায়েল বা আমেরিকার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র করলে তাকে 'আত্মরক্ষা' বা 'শান্তি প্রতিষ্ঠা' হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বিমুখী নীতি বা স্ববিরোধিতা।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন