জঙ্গিদের মাধ্যমে প্রকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা কি সম্ভব?


এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে
:-

১- জঙ্গিবাদ শব্দের উৎপত্তি 

২- ইসলাম ও জঙ্গিবাদ 

৩- জঙ্গিবাদ শব্দের অপপ্রয়োগ

 ৫- বিভ্রান্ত গোষ্ঠী: 

জঙ্গিবাদ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ধারণা, যা প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। এটি শুধু একটি একক কারণ বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জঙ্গিবাদ শব্দের উৎপত্তি

'জঙ্গিবাদ' শব্দটি এসেছে ফারসি 'জঙ্গ' থেকে, যার অর্থ যুদ্ধ বা লড়াই। সে হিসেবে 'জঙ্গি' অর্থ হলো যোদ্ধা বা লড়াকু। ঐতিহাসিকভাবে, এই শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হতো না। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধবিষয়ক কাব্যকে 'জঙ্গনামা' বলা হতো, যা কারবালার যুদ্ধ নিয়ে রচিত হয়েছিল। এই অর্থে 'জঙ্গ' শব্দের সাথে ইসলামের ইতিহাসের একটি সাহিত্যিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

তবে, বর্তমানে 'জঙ্গিবাদ' বলতে এমন একটি ইসলামী গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা যুদ্ধ বা পবিত্র জিহাদের মাধ্যমে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেটাকে পশ্চিমারা  সন্ত্রাসবাদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।

ইসলাম ও জঙ্গিবাদ

ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। ইসলামে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, ত্রাস সৃষ্টি, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ব্যতীত কাউকে হত্যা করল সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল।" (সূরা আল মায়িদা: ৩২)। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, "প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মানুষ নিরাপদে থাকবে।

ইসলামিক পণ্ডিতরা একমত যে,  সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। যারা ইসলামের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়, তারা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে বিচ্যুত। অনেকেই আছে যারা পবিত্র জিহাদকে জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং নিজেদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে, এসব গোষ্ঠী ইসলামের বিধি-বিধানও পরিপূর্ণ মান্য করে না। এমনকি কি তারা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমাদের পা চাটা গোলাম।

জঙ্গিবাদ শব্দের অপপ্রয়োগ

জঙ্গিবাদ শব্দটি বিভিন্ন পক্ষ দ্বারা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অপপ্রয়োগ করা হয়:

 * পশ্চিমা মিডিয়া এবং কিছু রাষ্ট্র: প্রায়শই পশ্চিমা মিডিয়া এবং কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইসলামী সন্ত্রাসবাদকে বোঝাতে 'জঙ্গিবাদ' শব্দটি ব্যবহার করে। এটি একটি বিতর্কিত বিষয়, কারণ একই ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড যখন তাদের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে হয়, তখন সেগুলোকে 'স্বাধীনতার লড়াই' বা 'মুক্তিযুদ্ধ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যেমন: পূর্ব তিমুর বা সুদানের দারফুরের স্বাধীনতাকামীরা পশ্চিমাদের চোখে মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তান, চেচনিয়া বা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীরা প্রায়শই জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি পায়। এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে একপেশেভাবে চিহ্নিত করা হয়।

 * রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য: অনেক সময়, কোনো দেশের সরকার বা শাসকগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য এই শব্দ ব্যবহার করে। বিরোধী দল বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ফলে অনেক সময় প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায় এবং নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হয়।

 * ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য জঙ্গিবাদ ইস্যুকে ব্যবহার করে। তারা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে অস্ত্রের ব্যবসা চালায় এবং উদীয়মান রাষ্ট্রগুলোর উত্থান ঠেকাতে জঙ্গিবাদকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। কখনো মুসলিমদের দ্বারা জঙ্গিবাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটানো হয়, আর তারপর তারাই ঢালাওভাবে মুসলিমদের জঙ্গি হিসেবে প্রচার করে।

 * বিভ্রান্ত গোষ্ঠী: কিছু বিভ্রান্ত গোষ্ঠী নিজেদের উগ্রবাদী কার্যক্রমকে 'আড়ালে রাখার জন্য ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা' বা 'জিহাদকে জঙ্গিবাদ বলে দাবি করে। তারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেয় এবং নিরীহ মানুষ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। যদিও তাদের এই কাজ ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী, তবুও তারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে।

সংক্ষেপে, জিহাদী গোষ্ঠীকে জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা  তৈরি করে জিহাদী কর্মতৎপরতাকে সহিংস এবং চরমপন্থা বোঝানোর জন্য। ইসলাম এই ধরনের কার্যকলাপকে সমর্থন করে না।  বিভিন্ন গোষ্ঠী ও রাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই শব্দের অপপ্রয়োগ করে থাকে, যা প্রায়শই মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিমান দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু ও ইসলাম।

একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য (অন লাইন বা অফ লাইনে)কি কি নীতিমালা অনুসরণ করা উচিত।

মুসলিম উম্মাহ কি জাতি সংঘের মানবাধিকার অনুসরণ করবে নাকি কোরআন সুন্নাহ বর্ণিত মানবাধিকার?